- Advertisement -

ফিলিস্তিনের পরিচয় মুছে ফেলতে চায় ইসরাইল

এবার গাজায় যেটা ঘটছে, সেটাকে শুধু গণহত্যা বা জাতিগত নিধন হিসাবে বর্ণনা করা যায় না। ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞতার বাইরে এটা আরও বড় কিছু। আর তা হচ্ছে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলা। ফিলিস্তিনের পরিচয় বলে আর কিছু না থাকা। খবর আল-জাজিরার।

গাজার মানুষের এই অবর্ণনীয় কষ্টের প্রতি বিশ্বের আপাত উদাসীনতার যে নিষ্ঠুরতা, তার চেয়ে ভয়ংকর ভীতির ব্যাপার হচ্ছে- ফিলিস্তিনের ভাগ্যে ভবিষ্যতে কী ঘটতে যাচ্ছে।

আজকে জীবিত প্রতিটি ফিলিস্তিনি হয়তো রাষ্ট্রহারা হয়ে গেছে, নয়তো গৃহহীন হওয়ার নৃশংস অভিজ্ঞতা পেয়েছে। অথবা ঘুম থেকে জেগে দেখেছে, তাদের পিতামাতার জন্মভূমি ছিল কাল্পনিক। ১৯৪৮ সালের আগের সব মানচিত্র, পতাকা, ছবি, সংস্কৃতি, এমনকি মুদ্রা যাতে প্যালেস্টাইন লেখা ছিল, তা যেন অনুমিত মিথ্যা ছিল। আজকের অ্যাপল গুগল সব ডিজিটাল ম্যাপে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কোনো অস্তিত্ব নেই। প্যালেস্টাইন লিখলে আসে ইসরাইল। গাজা লিখে সার্চ দিলে সেটিও দেখায় ইসরাইলের অভ্যন্তরে ছোট্ট একটি উপত্যকা। দু-একটা মানচিত্রে ‘ফিলিস্তিন অঞ্চল’ বলে জোড়াতালি কিছু পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু সেই শব্দযুগলের প্রধান কিওয়ার্ড ‘অধিকৃত’ শব্দটি পাওয়া যাবে না।

এটা শুধু ফিলিস্তিনের জনগণকে হত্যা করা নয়, তাদের দেশকে বেদখল করা নয়, বরং ‘ফিলিস্তিন’ শব্দটাই মুছে ফেলা হচ্ছে। যুদ্ধের সময় এমনকি শান্তির সময়েও আমাদের চেতনা ও বয়ান থেকে ফিলিস্তিনকে ইচ্ছাকৃতভাবে অদৃশ্য করা হচ্ছে।

আরব রাষ্ট্রগুলো ও ইসরাইলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কথিত যে ব্লকবাস্টার চুক্তি ‘আব্রাহাম অ্যাকোর্ডস’, সেখানকার সব আলোচনায় প্রধান সংক্ষুব্ধ পক্ষ ফিলিস্তিনের জনগণকে বাদ রাখা হয়েছে। যে ফিলিস্তিনের দুর্দশা আরব ও ইসরাইলের শান্তির জন্য একক বৃহত্তম বাধা, এ রকম একটা গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে সেই ফিলিস্তিনের কোনো প্রতিনিধিকে কেন্দ্রীয় অংশীদার না রাখা আব্রাহাম অ্যাকোর্ডসকে সমালোচিত করেছিল। আব্রাহাম চুক্তি যতটা না উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করে, ফিলিস্তিন তার চেয়ে বেশি অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে।

এখন ফিলিস্তিনে দখলদার রাষ্ট্র ইসরাইল বর্তমানে যে গণহত্যা অভিযান চালাচ্ছে তা সর্বজনীনভাবে ও ভুলভাবে ফিলিস্তিনকে বাদ দিয়ে ‘ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধ’ হিসাবে বর্ণনা করা হচ্ছে। যেন ঘটনা এই ৭ অক্টোবরেই শুরু! এর মধ্যে কোনোভাবে ৭৫ বছর ধরে ইসরাইলের দখলদারিত্ব, নিপীড়ন ও বর্বরতার শিকার ফিলিস্তিনি জনগণের কোনো ব্যাপার নেই!

এই বদমায়েশি প্রচারণা দুটি কারণে গভীর সমস্যাজনক। প্রথমত, এখানে ভালো ও মন্দের একটা সরল গল্প বলা হচ্ছে। যেখানে ইসরাইল অত্যন্ত শান্তিপ্রিয় ও গণতান্ত্রিক মানসিকতা নিয়ে তার ভূমিকা পালন করছে আর হামাস অত্যন্ত খারাপ ও বর্বর জঙ্গিগোষ্ঠী, যারা কারণ ছাড়া হঠাৎ আক্রমণ করেছে। অথচ হিউমান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, এমনকি খোদ ইসরাইলের বেশকিছু মানবাধিকার সংগঠনের মতে, ইসরাইল একটি বর্ণবাদী ও অবৈধ দখলদার রাষ্ট্র, যারা পৃথিবীতে সবচেয়ে অমানবিক উন্মুক্ত কারাগার কায়েম করেছে।
দ্বিতীয়ত, এই বর্ণনা থেকে অত্যন্ত বাজেভাবে কৌশলে ফিলিস্তিনকে বাদ দেওয়া হয়। ৭ অক্টোবরের হামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্য সব বিব্রতকর পার্শ্বপ্রশ্ন ইসরাইল এড়িয়ে যায়। এর সঙ্গে যে ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর ইসরাইলের পৌনে ১০০ বছরের দখলদারিত্ব ও বর্বরতার সম্পর্ক রয়েছে, সে কথা শুনতে চায় না।

একেবারেই সরল সত্য হচ্ছে, ‘ফিলিস্তিন’ শব্দটি ইসরাইলের জন্য অস্বস্তিকর। এই শব্দটি উচ্চারিত হলেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের ভাবমর্যাদা ভেঙে পড়ে। ফিলিস্তিন শব্দটার সঙ্গে এত বেশি নিপীড়ন, পরাধীনতা ও গণহত্যার গল্প জড়িত, এর ভুক্তভোগিতা সর্বজনীনভাবে এত স্বীকৃত, ফিলিস্তিন নিয়ে কথা উঠলে ইসরাইল আর কথা বলতে পারে না, যতই মরিয়া চেষ্টা করে, তাদের অপরাধ ঢাকতে পারে না। ফিলিস্তিনের নৈতিক ওজন এত ভারী, যতবার শব্দটি উচ্চারিত হয়, ইসরাইলের পিআর থেকে ফুটো বেলুনের হিসহিস স্বর শোনা যায়। এত এত সমুদ্রসৈকত দিয়ে, অনেক অনেক রিসোর্ট, টেক ইউনিকর্ন করে ইসরাইল তার হাত থেকে ফিলিস্তিনের রক্তের দাগ স্থায়ীভাবে মুছতে পারে না।

এই কারণে ইসরাইল মনে করে, ফিলিস্তিনের ভারি নৈতিক বোঝা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে তাদের আক্ষরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। মানচিত্র থেকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলতে হবে। সেই কাজটাই তারা করে যাচ্ছে। আবার ইসরাইল জাতিসংঘের সামনে দাঁড়িয়ে এখনোা বছরের পর বছর বলে যাচ্ছে, একটি বর্বর জাতি থেকে তারা নিরাপদ থাকতে চায়, অথচ সেই জাতিকে তারা মানচিত্র থেকে মুছেই ফেলছে। কী হাস্যকর! মজা করাটা উন্মাদনার হতে পারে, কিন্তু ভন্ডামি অত্যন্ত স্পষ্ট।

 

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published.

প্রতিনিয়ত সি এন এন ঢাকার সর্বশেষ খবর মোবাইলে নোটিফিকেশন পেতে.. হ্যা বিস্তারিত